Header Ads

Header ADS

ই-ইলশেগুড়ি ৪



প্রচ্ছদ শিল্পী - সুমনা ঘোষ ও মধুরিমা মজুমদার

 সূ চী প ত্র











স ম্পা দ কী য় 


    প্রকাশিত হল ই-ইলশেগুঁড়ির চতুর্থ সংখ্যা। মুদ্রিত চর্তুমাসিক ইলশেগুঁড়ি পত্রিকার পাশাপাশি দ্বিমাসিক অনলাইন পত্রিকা ই-ইলশেগুঁড়ি এবার প্রিয় পাঠকদের চাহিদা পূরণ করতে আত্মপ্রকাশ করল মাসিক পত্রিকা হিসাবে। পাঠকদের ভালবাসায় আমরা অভিভূত।
        প্রচুর লেখা আসছে আর তার মধ্যে ভাল লেখার সংখ্যাও অল্প নয়। তাই, স্বভাবতই সব মনোনীত লেখাই একটি সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া কঠিন। যাঁরা লেখা পাঠান তাঁদের সবাইকে প্রাপ্তি স্বীকার করা হয়। অনুগ্রহ করে ধৈর্য্য ধরে পত্রিকার সংখ্যাগুলি পড়ুন, আপনার ভাল লেখাটিও যে কোন সংখ্যায় দেখতে পাবেন।
       প্রিয় বন্ধু, সম্পাদকমণ্ডলীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৃজন পাল বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে গত মাসে। এই সংখ্যায় ওর দুটি কবিতা দেওয়া হল।
            সুসাহিত্যের মধ্যে থাকুন, সুস্থ থাকুন।

শিল্পী ও শিল্প  


শিল্পী জীবন বিশ্বাসের সঙ্গে কিছুক্ষণ

সুবোধ পাণ্ডে





জানালা খুলে দিলেই ময়ূরাক্ষী নদীর রূপের স্নিগ্ধ হাতছানি কিশোর মনটাকে চিত্রময়তার পাঠদানের ইশারা করত। প্রান্তর উজিয়ে ভেসে বেড়াত লালমাটির ঘ্রাণ। সারি সারি তাল তমালের ছায়া ঘেরা বীরভূমের পুকুরপাড়া গ্রামের এই কিশোরের তুমুল ভাললাগা তখন সে গ্রামেরই এক প্রতিমা শিল্পীর মূর্তিগড়াকে ঘিরে। সেই পাল শিল্পীর উৎসাহ অনুপ্রেরণায় মূর্তি গড়ায় হাত পাকতে থাকে। স্বপ্নে তখন নিজেকে প্রতিমা শিল্পী হিসেবে দেখবার উচ্ছ্বাস কেবল।

সেইসঙ্গে চলে ছবি আঁকাও।মা সন্ধ্যাদেবী, বাবা অমূল্য বিশ্বাসও বড় একটা বাঁধা দেন না।

মামা লিখতেন কবিতা। সেইসঙ্গে  স্নেহের ভাগ্নেকে  বিভিন্ন জায়গায় ছবি আঁকার কম্পিটিশানে অংশ গ্রহণের জন্য নিয়ে যেতেন।

বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয় শান্তিনিকেতন। ইচ্ছে হলেই এই  কিশোর চলে যেতেন বিভিন্ন মেলায়। বাউল ফকিরদের দর্শন করেছেন। শুনেছেন খোলা আকাশের নিচে তাদের উদাত্ত কণ্ঠের গান। গানের মানে যদিও পরে বুঝেছেন। এভাবেই চলছিল শিল্পী জীবন বিশ্বাসের ছেলেবেলার  জীবন।

ব্যবসায় তেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা না আসায় পিতা সিদ্ধান্ত নেন কলকাতায় চলে আসবেন। প্রথমে একা, এরপর পরিবারের সকলকে নিয়ে চলেও আসেন। শুরু হয় ঘোরতর জীবন সংগ্রাম।

একটু একটু করে বড় হবার সাথে সাথেই আর্থিক সামাজিক চিত্রের নানা রূপকে চিনতে থাকেন বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা মধ্যে দিয়ে। জটিল কুটিল বীভৎসতায় ভরা,মুখোশে ঢাকা ভণ্ড সমাজের বিচিত্র চরিত্র দেখতে দেখতে  দুঃখে চোখে জল এসে গেলেও মনের ভিতর কোথাও একটা আশার প্রদীপ জ্বলছিল — ‘‘পারব। আমি ঠিক বড় হতে পারব। আমাকে পারতেই হবে।’’ তাই শত বাধাবিপত্তির মধ্যেও চালিয়ে গেছেন ছবি আঁকা।

এরই মাঝে যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সে বাড়িতে ভাড়া এলেন তবলাবাদক যমজ ভাই।তবলা বাজাতে বাজাতে তারা এতটাই তন্ময় হয়ে থাকতেন যে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়ে আসত। কি অসম্ভব প্রাকটিসের ধরন! ছবি আঁকার ক্ষেত্রে উৎসাহ যোগালেন এই ভ্রাতৃদ্বয়। এদের কথায় ছবি আঁকার অনুশীলন বাড়িয়ে দিলেন আরও।

অনুপ্রেরণা এবং ভরসা যোগালেন কলেজ জীবনের এক বন্ধু। চিত্রবিদ্যা শেখার জন্য  নিয়ে গেলেন শিল্পী আশিস মণ্ডলের কাছে। আশিস তাকে বললেন, ‘‘এইতো সবে শুরু, তোমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি হবে। আরও  প্র্যাকটিস বাড়াতে হবে।’’  উপযুক্ত শিষ্যের জন্য মন প্রাণ ঢেলে দিলেন তিনি। ফলস্বরূপ আর্টকলেজে চান্স পেলেন জীবন।

আর্ট কলেজে পড়ার তো খরচ অনেক। কিভাবে নিজের খরচ চালাবেন? এজন্য তাকে লোকের বাড়ি লজিংয়ে থেকে তাদের নানান ফাইফরমাশ খাটতে হয়েছে। বাজার করা, সে বাড়ির ছেলে মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এইসব করতে হয়েছে। প্রয়োজনে অন্যত্র নাইট গার্ডের কাজও করেছেন। এছাড়াও শিল্পী আশিস মণ্ডল ও তিনি, দুজনে মিলে বিভিন্ন অর্ডারের কাজ করেছেন। কখনও মেলায় মেলায় বিভিন্ন পরিসরে ছবি এঁকে, কখনও প্যাণ্ডেলের আর্ট সংক্রান্ত কাজে ব্যাপৃত থেকেছেন।

এই সময় কলকাতার কেষ্টপুরে পরিচয় হয় আরেক শিল্পী নীহার দাসের এর সঙ্গে। তারই উৎসাহে অনুপ্রেরণায় বিদেশি শিল্পীদের অনুকৃতি করতে করতে শিখেছেন অনেক কিছুই। বিশেষ করে ডাচ শিল্পীদের শিল্পের ধরন তাকে এক অন্য মাদকতার ভুবনে আসক্ত করে রাখতো।

কলেজে পড়াকালীন এক চমৎপ্রদ ঘটনা ঘটে। বিড়লা আকাদেমিতে বিশ্ববিখ্যাত ওস্তাদ জাকির হোসেনের সঙ্গী যমজ  তবলাবাদকদের চিনতে পারেন তিনি। তারা আর কেউ নয়, সেই স্ট্রাগলিং পর্বের দুই অনুপ্রেরণা দাতা। এগিয়ে নিজের পূর্ব পরিচয় দেন। আনন্দে আপ্লুত হন তারাও। এবং সত্যি সত্যি শিল্পকলার জীবন বেছে নেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানান তারা। এই শিল্পীও প্রথম জীবনে তাদের অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল প্রসঙ্গটি স্মরণ করতে ভোলেন নি। অনেক আড্ডা হয়েছিল সেদিন।

বর্তমানে দেশে বিদেশের বহু আর্টগ্যালারিতে এই শিল্পীর ছবি প্রদর্শিত প্রশংসিত হয়েছে। শিল্পই এখন পেশা তার।

তার ছবির বিষয়ের কথায় মনের মণিকোঠায় উঠে আসে ছোটবেলার ময়ূরাক্ষী নদী, তার পাড়ের দৃশ্য, বীরভূমের খোলা মাঠের বিচরণরত প্রাণীদের প্রসঙ্গ। ছবি হিসেবে উঠে আসে সেই ছেলেবেলাকার রেলগাড়ির ছবি। কখনও ক্ষত চিহ্নে চিহ্নিত বোয়াল মাছের মাধ্যমে তুলে ধরেন দেশভাগের যন্ত্রণার ছবি। সমস্যা সঙ্কুল চিহ্নের প্রতিরূপে কখনও কুমীরের সঙ্গে মানুষের সহবাসকে তুলে ধরেন। ইনটেলেকচুয়াল’দের ভয়ঙ্কর ভণ্ডামির রূপ দেন রামছাগলের আদলে। এছাড়াও তার ছবিতে যেন অবলা প্রাণী গরু, শান্ত নিরীহ সৎ মানুষেরই  প্রতিরূপ পায়। ভালমানুষির সুযোগ নিয়ে কিভাবে এই সমাজ সভ্যতা তার সঙ্গে প্রতারণা করছে, তাকে বোকা বানাচ্ছে  সেইসব কোলাজের সারি এঁকে চলেন আজও।

বিভিন্ন মাধ্যমে ছবি আঁকলেও মূলত  অ্যাক্রিলিক অন ক্যানভাসকেই পছন্দ করেন তিনি।

শিল্পকলা চর্চায় বিভিন্ন সময়ে উৎসাহ পেয়েছেন বিশিষ্ট শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের ও লালু প্রসাদ সাউয়ের।

ভাল লাগে গণেশ পাইন, কে জি সুভ্রমনিয়ামের কাজ। ভাল লাগে সুবোধ গুপ্তার কাজ।বিদেশি শিল্পীদের মধ্যে সালভাদর দালির কাজ অসম্ভব ভাল লাগে। মাতিসের কাজও তার অসাধারণ লাগে।

শিল্পী মন বাঁচিয়ে রাখার দারুণ উত্তেজক যে বিশ্ব সংসারের প্রকৃতির সখ্য সেকথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। তাই যেখানেই যান বিভিন্ন রাজ্যের গ্রাম অধ্যুষিত এলাকা, পুরনো ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, নদীর কাছে যান। স্ত্রী কলেজে শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত। নিজস্ব বিষয়ে গবেষণার পাশাপাশি তিনিও ভালবাসেন ঘুরতে। ছুটির অবকাশ পেলেই তাই দুজনে বেড়িয়ে পড়েন।

এই দীপ্ত যৌবনের জীবনের ভেতর দিয়ে চলার সময়  ময়ূরাক্ষী তটের  সেই কিশোর যেন অলক্ষ্যে আজও অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে এই সব ভাললাগা প্রকৃতির বৈচিত্র‍্য খচিত মোহময় রূপের দিকে। ফুরোয় না তার কিছুই ফুরোয় না।







সৃজন পাল স্মরণ 

(গত মাসে অকস্মাৎ প্রয়াত হন ইলশেগুঁড়ির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কবি সৃজন পাল। 
ই-ইলশেগুঁড়ির গত সংখ্যা সৃজন স্মরণে প্রকাশিত হয়। 
ই সংখ্যাতেও তাঁকে স্মরণ করল পত্রিকা।)


ইলশেগুঁড়ি পত্রিকা পরিবারের সৃজন স্মরণে বিশেষ সংখ্যা

শিল্পী সমীর  দত্তর (উপরে) ও শিল্পী দীননাথ সাহার (নীচে)

চোখে সৃজন 



কবি সৃজন পালের হস্তাক্ষরে লেখা দুটি কবিতা

কালধ্বনি পত্রিকার সৃজন স্মরণ


নিজস্ব বাসভবনে পরিবারের সৃজন স্মরণ


দুটি কবিতা - চিন্ময়


নীরব রাতের তারা

কলমে থেকে ঝরতো প্রতিবাদ
আখরগুলো প্রতিবাদের তিরে,
সাহিত্যে তার প্রবল অনুরাগ
হঠাৎ বিলীন মহাসিন্ধুর তীরে। 

চড়াই পথের পাকদণ্ডী বেয়ে
অন্তবিহীন একলা চলার পথে,
কালস্রোতে এসেছে ঢেউ ধেয়ে
মিশেছে ঢেউ শ্রান্ত ছায়াপথে। 

বেদনাতে আকাশ ঢাকে মুখ
অসময়েই বেলাশেষের গান,
চোখের তারায় অশ্রুমাখা দুখ
বিষন্নতায় নীরব কলতান। 

বন্ধু এখন আগুন মেখে গায়ে
হারিয়ে গেছে অজানা উদ্দেশে,
স্মৃতি এখন জড়ায় পায়ে পায়ে
হঠাৎ জীবন পরিক্রমার শেষে। 

রাত্রি নামে আজও বটের ছায়ে
কালোয় ঢাকে আজও চরাচর,
একলা বসি আঁধার মেখে গায়ে
স্বপ্নে ভাসি জড়িয়ে পরস্পর। 

পথের টানে একলা বাউল মন
সুজন ঘেরা চেনা পথের ভিড়ে,
কালের পাতায় হঠাৎই পদার্পণ 
বন্ধু বিলীন অশ্রু নদীর তীরে।

চলার পথে আপন খেয়া বেয়ে
সুহৃদ ছিল সবার হৃদয় জুড়ে,
অনুভবে আজও আছে ছেয়ে
তারা হয়েই হৃদয় অন্তঃপুরে। 


ধ্রুবতারা 

যে পথে তার অবাধ বিচরণ
মুক্ত মনে মানব সাগর তীরে,
উজান চলায় হঠাৎ অঘটন
শূন্যে উধাও লক্ষ তারা ভিড়ে। 

আকাশ যখন পূর্ণিমারই স্নানে
স্নিগ্ধ আলোর বর্ণালিতে ভাসে,
জাগতো আখর সুক্ষ ছোঁয়া টানে
তারই হাতের বিনুনি বিন্যাসে। 

খ্যাতি ধীরে মেলছে যখন পাখা
খুশির হাওয়া বইছে মেঠো সুরে,
কালো মেঘে আকাশ পড়ে ঢাকা
বিলীন খুশি হারায় যোজন দূরে। 

বসত এখন শান্ত স্মশান 'পরে
ইচ্ছেডানায় তবুও যেন ভাসি,
সঙ্গ পাবার ইচ্ছে প্রবল করে
নদীর তীরে আবার পাশাপাশি। 

দুচোখ জুড়ে এখন নেভা লয়
চকিত পলে ধ্রুবতারা যায় খসি,
আঁধার কে যে বড্ড লাগে ভয়
অন্ধকারের গা ঘেঁষে তাই বসি। 

অন্তবিহীন একলা চলার সুরে
ফিসফিসিয়ে বলছে যেন কারা,
চির অমর থাকবে হৃদয় জুড়ে
চোখের তারায় বন্দী ধ্রুবতারা। 

বিশেষ কবিতা সংখ্যা

গুচ্ছ কবিতা

সুপ্রিয় মান্না

অসময় 


অস্পষ্ট হলেও চেনা যায়; বোঝা যায় কারোও উপস্থিতি।
চৌকাঠ পেরিয়ে আসবে বলে; হুংকারে কান পাতা দায়।

 বুকের ভেতর তোলপাড় করা ভয়।

রাতের পর রাত কাটে অনিশ্চয়তায়
সাবধানতায় ভারী হয়ে ওঠে পা

মনে হয় কালো কটাক্ষ দৃষ্টিতে পুড়ে যাবে নমনীয় শরীর।
 শরীরে থাকে আঁচড়ের ছাপ।

শকুনের বেশে কারা যেন ঠুকরে খাচ্ছে  মনুষ্যত্বকে -- দলবেঁধে।

দলের পর দল আসছে-খাচ্ছে-যাচ্ছে...
সেই ইতিহাস থেকে।
পরাজিত, নির্যাতিত মানুষ শুধু  মরে যায় নির্দোষে।

মুখ-মুখোশের আড়ালে তলিয়ে যায় সত্তা অন্ধকার নীলে।
মনের ভিতরে খুঁড়তে-খুঁড়তে কবর অবশেষ।

সুরঙ্গ পথে যেতে যেতে  হারিয়ে গ্যাছে আসল পথের ঠিকানা।


অসহায় মানবতা

প্রকৃতির সাথে কথা বলা হয়নি কতকাল।
ঝরাপাতারা শীতঘুম থেকে জাগে নি বহুকাল।
বনানী পেরিয়ে পথ যে দিকে গেছে, সে পথে আজ কেন জানি না লাগে বিষম ভয়।
তবুও চুপ করে আছি এই নিবিড় রাতে কালপেঁচা টার মতো একাকী।
জনমানবহীন শুনশান রাস্তা-ঘাট কিসের সংকেত দিচ্ছে? জানা নেই, 
জানা নেই নতুন পথের দিশাও।
মারন স্রোতে বিশ্ব জুড়ে ভেসে চলে মৃত্যু মিছিল।
এক-একটা করে দিন গুনি-
অনিশ্চতায় ঘেরা নিঃসঙ্গ এ জীবন অপেক্ষায় থাকে চৌকাঠ পেরিয়ে সুস্থ ও জীবাণু মুক্ত এক নতুন ভোরের...

-- দাঁড়িয়ে আছি দরজার একপাশে।

দীনেশ সাউ

(১)

অন্য নীরবতা


স্তব্ধতার মাত্রা মাপতে 
একাকীত্ব মেনে নিয়েছি স্বেচ্ছায়।
যদি নির্বাসন ভাবো ভুল করবে,
যে নৈঃশব্দে শর্করার সংশ্লেষ হয়
-ক্লোরফিল কণায়
তাকে যখনই মাপতে চাই
একবুক তাজা অক্সিজেনে ভরে ওঠে অ্যালভিওলাই!
আর এক অন্য নীরবতা জাইলেম ফ্লোয়েমের মাঝে 
সাইটোপ্লাজমের নিঃশব্দ রসস্রোত
সকাল কিংবা সাঁঝে।

তারপর আসে রাত্রির নির্জনতা 
চুপকথাদের রূপকথা মেশা গোপন যত কথা
নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ে আলোকবর্ষ ঘুরে
যেখানে অরুন্ধতীর দীপ জ্বলে নীরবে
বশিষ্ট্যের অনতি দূরে।

(২)

উলঙ্গ চাঁদ

চাঁদ,
তুমি আমাকে নিভৃত আকাশ দিয়েছ
-অকৃপণ জ্যোৎস্না।
চিলে কোঠার ঘর, নির্বাসনের ভাবনা।
সবুজ মাঠের আলপথ ধরে হেঁটে চলা
ক্ষেত মজুরের গান
জীবনের উপলব্ধিতে মিশে যাবার দুরন্ত আহ্বান। 
অমাবস্যার আকাশেও তোমাকে অনুভব করি যখন
কালো ঘোমটায় কলঙ্ক ঢাকার চেষ্টা প্রাণপণ
ওই একটা দিনই তো যা
তারপর প্রতিটা রাত 
একটু একটু করে বিবস্ত্র হয়ে যাওয়া
যেন ঘোমটা টেনে সরিয়ে নেয় কেউ
অতঃপর বক্ষদেশ,
উন্মুক্ত নাভি জুড়ে যৌনতার ঢেউ!
নেংটিপড়া শুক্লা ত্রয়োদশী এসে দাঁড়ায় দুই উরুর ফাঁকে
সারাটা পৃথিবী রতির জ্যোৎস্না মাখে
একদিন পর পূর্ণিমা
সেই রাতে তুমি বস্ত্রহীনা অনুপমা! 
নগ্নদেহী চাঁদ
পূর্ব হতে পশ্চিমে যৌনতা ছড়াও সারাটা রাত
ভোর হয়, অন্ধকার দিগন্তে এসে জমে
কামুক পৃথিবী মুখ ফেরায় অভিনয় ভরা সংযমে।
নতুন করে তুমি টেনে নিতে চাও কালো রঙের কাপড়
তবু পৃথিবী তোমাকে উলঙ্গ করে এক পক্ষ অন্তর।

দেবাশিস তেওয়ারী


অবগাহনের মন্ত্র

সে এক বৃষ্টিঘোর, অমানিশা তর্জমা করেছি।
প্রথম রাত্রিকে আমার ভালোলাগার ইচ্ছেডানা দিয়ে
ভিজিয়েছিলাম। স্তবকের পর স্তবক জুড়ে
সে সব ছিল ভালবাসার বিমূর্ত অধ্যায়।
আজ রাত্রিটিকেই উপেক্ষা করি, যে আমার
আচ্ছাদনের সামগ্রী হয়েছে। তবে কি আবার
ভাসছি সেই আদিমতার পঙ্কিল দামে।
ভাসতে চাই আমি, নি-শ্বাসটুকু জিইয়ে রেখে
তালগাছের ডোঙা হয়ে অন্যকেও ভাসাতে চাই----
বিস্ময়চিহ্নের মতো তখন অবগাহনের মন্ত্র আমার সামনের
ডুবজলে ভাসতে থাকে দেখি।

গন্তব্য

এভাবে পণ্ডশ্রম করে জীবনের বৈধব্য ঘেঁটে
তুলে আনি এক-একটি গন্তব্য। অপমানিতের
চরম ছায়ায় যারা আজও হেঁটে বেড়ায়। কবে
কোন দিকশূণ্যপুর থেকে আসা এক-একটি
গন্তব্যের কিনারা ছোঁয় তালপুকুর রোড।
যেখানে কোনও ঘটিও ডোবে না। আর অসহিষ্ণু আলোয়
দেখি এক-একটি বৈধব্য, তালপুকুর রোডের উপরে তৈরি
করা ওভারব্রিজে সারসার দাঁড়িয়ে থাকে আর
প্রত্যাশা করে পুরুষ-হৃদয়।

ডা. শুভায়ু দে 

বশীকরণ


হঠাৎ সেদিন রোব্বারেতে, পুতুলমাসীর ছেলে।
দৌড়ে এলো আমার বাড়ি, সমস্ত কাজ ফেলে।

শুধাই তারে," ব্যাপার কি হে? এর'ম আসার কারণ।"
ও বললে, " আস্তে বলো, চিৎকার যে বারণ।"

ঘাটের পারে বটের ঝুরি,তার নীচেতে বেদী।
সেই বেদিতে নতুন যোগী,পেতে নতুন গদি—

বলছে নাকি সেই যোগীবর, যার যা আছে বায়না।
এক মিনিটেই মিটিয়ে দেবে,বলছে,"কাছে আয়না।"

সকালবেলা তুলসী খেতে,সোমবারেতে উপোস।
শনিবারে ফলাহার, তার চলবে না কো আপোষ।

এসব শুনে হন্তদন্ত  হয়েই রওনা দিলাম।
সাথে নিলাম খুচরো টাকা আর চাকরীর ফর্ম।

সন্ধ্যে হয়ে এস'ছে তখন, ভিড় ও নেই কম।
আমার পালা আসতেই,হাতে গুঁজে দিলাম ফর্ম।

ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল,তারপর বলে," বোস।
তোর কেসটা দেখছি পরে,করবিনা ফোঁসফোঁস।"

অগত্যা আর কিইবা করি, এক একে সবাই।
যার যা রোগ সল্ভ হলো আর পেলো যে তাই দাওয়াই।

অবশেষে ডাক পড়লো,বললেন," একটা দাবী।
এই ফর্মটা ভরবো আমিও,ফিলাপ করে দিবি!"

প্রেম-বিবাহ-মায়াচক্র


বিনুনির আগায় রাখা জন্মফাঁস।
একচুল এদিক ওদিক হলেই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাবৃন্ত।
নিবু নিবু জ্যাসমিন তেলের ছোঁয়াচে
কোলঘেঁষা অন্ধকার পুংমুখ ঢেকে দিলেই
উপন্যাসের খাতিরে তাকে 'প্রেম' বলে থাকি।
ওই চুলের মায়ায় জড়াতে চাই না।
তার চেয়ে বরং কিছু উপবাসী বই দিতে পারো।
পাঠকের ক্লাইম্যাক্সতৃপ্তির রসনায় খিদে মিটবে তার।
খিদে মিটবে হাঁ করে থাকা কয়েকটি কাটাকুটি হাতরেখার।
জন্মের পর থেকেই যারা কারোর হাতের সাথে মেলানোর জন্য
লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছে জ্যোতিষবিদের কাছে।
একটি চিরন্তন বিবাহপরিক্রমা।
নিন্দুকেরা বলবেন সনাতনী প্রেম বলে কিছু নেই।
দেহকোষে ফুটিয়ে তুলতে হয় প্রেমপুষ্প।
সব প্রেম মায়া কিন্তু সব মায়া প্রেম নয়।
যেমন রূপ,চুলের সুবাস মায়া,
তাকে জড়িয়ে থাকা প্রেম, প্রেম নাও হতে পারে।
অচিরেই মোহভঙ্গ হতে পারে।
শুধু রয়ে যায় একটি চিরন্তন মায়াচক্র।

অনাদি মুখার্জী

আমাদের গ্রাম


ছায়ায় ঘেরা মায়ায় ঘেরা আমাদের এই  গ্রাম,
আঁকা বাঁকা নদী বয়ে চলেছে অবিরাম!
যাওয়া আসার  পথের দূই ধারে,
জামরুল আর বকুল গাছ আছে যে  দাঁড়িয়ে!
ছোট্ট একটা পুকুর পড়ে এই  গ্রামের মাঝে,
সবাই মিলে সাঁতার কাটে সকাল বিকাল সাঁজে!
রাখাল বাজায় বাশের বাঁশি মিষ্টি তার সুর,
নীল আকাশে উড়ে পাখি দূর বহু দূর !
ঝোপে ঝাড়ে বাঁশ বাগানে বসে থাকে শালিকের ঝাঁক,
অন্ধকারে জোনাকি জ্বলে আর শুনবে ঝিঁঝিঁপোকা ডাক!
শৈশব কালে  স্মৃতি আজ যে খুব মনে পড়ে ,
আমি যে ছিলাম তখন আমাদের ঐ  গ্রামে!


কবিতা,, মনের ক্যানভাসে 


আজো মনে পড়ে সেই শৈশবের দিনগুলো,
মন ছুঁয়ে থাকে থাকে আমাদের গ্রামের শান্ত নদীর কূলে !
থাকতো সেই খানে গ্রামের দুই ধার পাড়ে পাড়ে ,
সারি সারি কত পলাশ আর কলমিলতা ছেয়ে !
সেখানে আমার বনধু ছিল কত রঙিন প্রজাপতি ,
তাদের পিছনে ছুটতাম আর খেলতাম সারাদিন ! 
সোনালী বিকেলে আমি কত উড়িয়েছি রঙিন ঘুড়ি,
সবার আড়ালে করেছি  তেঁতুলের আঁচার চুরি !
রিমঝিম বর্ষায় ভিজে খেলতাম ছোটবেলায় ,
মাঠের সেই জমা জলে কাগজের নৌকা করে ভাসিয়ে দিতাম ! 
ছোট্ট বেলায় সেই দিনগুলি পারিনা আজ ভুলিতে ,
মনের ক্যানভাসে এঁকে রাখি বিনা রঙ তুলিতে !

একক কবিতা

রশি

অমিতাভ দাস

পথে গড়াচ্ছে চাবুকের চুম্বন
সপাং আওয়াজের শব্দে ঢুলুঢুলু চোখ মেলে রাজা তাকালেন,তারপর আবার বুজে ফেললেন চোখ।
সপাং সপাং সপাং কানে যেন ঢেলে দিচ্ছে মধু,তার সাথে কীটের মতো লোকটার গগনবিদারী চীৎকার আর ছোটো ছোটো শিশুদের কান্না,আহা!প্রাণ জোড়ানো।
এই না হলে ক্ষমতা!
ক্রমশ ঘুম জড়িয়ে ফেলছে অবয়ব।
যারা সভ্যতা গড়ে ভাঙে তারা রাতজাগা লালচোখে নীরবে নিভৃতে উঠে আসছে প্রত্যেকের হাতে টুকরো রশি তারা হাতে হাতে গিঁট বাঁধছে,রশি ছুঁয়ে ফেলছে স্বর্গ-মর্ত-পাতাল,ছুঁয়ে ফেলছে ঘুমে ঢুলতে থাকা অবয়বগুলো।
পথ চুম্বন করছে শোষকের মুখ।

সুনীল চক্রবর্ত্তী 

লোকটা ল্যাম্পপোস্টে হেলাল দিয়ে বসে আছে, হাতে একটা বিড়ি  
ও বলে এইটা নাকি ওর ল্যাপটপ, কত স্মৃতিতে পূর্ণ ওর ওই ল্যাপটপ, 
এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে , সত্যি সত্যিই  বিড়ির দিকে তাকিয়ে ...
কেঁদে ওঠে আছড়ে ওই কান্নার সঙ্গে প্রশান্তি জড়িয়ে,
কেন কেও তার জানে না, হাওয়াতে কত কাগজ উড়ে যায় 
একটা কাগজ ওর হাতে আটকে যায়,তাতে এক তন্বী  যুবতীর ছবি।
ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে শতবার চুমুতে ভরিয়ে দেয় 
তারপর মরিয়ম , তুমি কেমন আছো কত কাল তোমাকে দেখিনি, 
জানোয়ার গুলো তোমায় হত্যা করেছে
পেট্রোল ঢেলে তোমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল 
তুমি আমার জীবনে কিংবদন্তী হয়ে আছো হ্যাঁ আজো, 
আছো তুমি আমার মননে - - -
এক দিন তোমার জলন্ত দেহাবশেষের চিহ্ন খুঁজতে গিয়ে আমি হতবাক মরিয়ম, 
কেন জানো ? কিছু বনজ লিলি ফুটে আছে মানবী আকৃতিতে 
ওরা হাসছিল আমায় দেখে 
আমি ক্ষনিকের জন্যে মেঘদূতের বিরহী যক্ষ হয়ে উঠেছিলাম, 
আমার প্রিয়তমা মরিয়ম, তোমার বিদেহী আত্মা শান্তি পাক, 
তুমি চিরনিদ্রায় শান্তিতে থাক প্রিয়তমা মরিয়ম
তুমি ঝড়  হয়ে আমার বুকে ফিরে এলে কত দিন পর
তুমি কি ঝড় হয়ে ফিরতে চাও আমার মনের ঠিকানায়, 
তাইতো আমার ল্যাপটপে তোমার ছবি স্পষ্ট 
মরিয়ম আমি বড় ক্লান্ত, অহরহ আমি দগ্ধ হই শুধু তোমার জন্যে, 
অপেক্ষায় থাকি, কত মধুমাস পার হয়ে যায়।
আমি আসছি মরিয়ম, খেলা ঘর সাজিয়ে রেখো লাল খয়েরি গোলাপে, 
তোমার ঠোঁট রাঙিয়ো বেদানা রঙে, আর থাকবে বসরাই আতর মাখানো রজনীগন্ধা 
 আমি আসছি মরিয়ম, আসছি আমি তোমার সাজানো খেলা ঘরে !!!
মানুষ
সঙ্কর্ষণ

তো, অঘোরবাবু একটি গাধা পুষিয়াছেন, 
দেখাদেখি অশেষবাবুও... ।
দুই গাধা একই মাঠে চরে... থুড়ি ইস্কুলে পড়ে।
মোটা মোটা বোঝা নিয়ে রোজ রোজ... হেঁ হেঁ।

অঘোরবাবু জানেন গাধা পিটিয়ে ঘোড়া হয়, 
অশেষবাবুর গাধা আদরে গোবরে থাকে।
"বাঁদর হবে হুঁহ্।রেস... সামনে লম্বা রেস, ভাগো।"
লাল চোখ, ধমকানি, পিটানি... বাবা রে।

দিন পাল্টায়, মাস যায়... বছর, যুগ ইত্যাদি।
রেসের মাঠ, জোরসে চাবুক, 
ছুটছে অঘোরবাবুর ঘোড়া..."আগে বাঢ়ো, অউর আগে।"
অশেষবাবুর ঘোড়া ট্র্যাকের শেষ দেখতেই পায়নি।

বছর দশেক পর... 

অঘোরবাবুর ঘোড়া এক দৌড়ে সিধা লণ্ডন, 
দাপিয়ে বেড়াচ্ছে... বিশাল ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু... 
কিন্তু ঠুলি পরা ঘোড়া পেছনে ফেরেনা... হেঁ হেঁ।
অশেষবাবুর ঘোড়াটা আর দৌড়ে পারেনি
তাই শেষে পিঁজরাপোল... মানে বাড়িই আর কী।

সাফল্যের ঘোর এখনো কাটেনি অঘোরবাবুর।
অশেষবাবুরও দুঃখের শেষ নেই।

গাধা...
ছিন্নপত্র 
সুনন্দ মণ্ডল 

লাল জলে চেতনার মায়া
বিষাক্ত করবী শুষে নেয় মোহ
শ্যাওলা গায়ে মাখে অবসন্নতা।

রঙ আর রঙিন পাতার ক্লোরোফিল 
খাদ্য সংশ্লেষে পরিণয় সম্বন্ধ
সবুজের বিকাশে মগ্ন শৈশব।

হলুদ মানেই ঝরে যাবার সময়
কিছু ছিন্ন পাতার স্কন্ধে বেঁধে রাখি
বিনয়ী বৃদ্ধের কুঁজো সংলাপ।

ছিন্ন পত্রের বাঁশিতেও বেজে ওঠে জীবন চক্র।
যেন কোন প্রত্ন-বদ্বীপ...


ব্যর্থ কবিতা
সমর দে

একটা বিশাল আকাশ দাও,
হৃদপিন্ড ছিঁড়ে অসুখ গুলোকে গেঁথে আসি,
দূর নক্ষত্র লোকে হারিয়ে যাক সব হাহাকার।
আবার হাঁটবো আমরা পৃথিবীর মাটির উপরে,
ঝুম বৃষ্টি জলে হেঁটে হেঁটে সীমান্ত রেখায় পৌঁছে যাবো,
আজ একটা আকাশ দাও
রেখে আসি সব ক্ষুধা, ব্যাথা,দুঃখ হাহাকার,
একটা সুই আর সুতো দিও
সালাই করে গেঁথে রেখে আসি।
তখন রাত্রির তারাদের মতো দ্রূপদী চোখে পৃথিবীকে দেখো,
কেমন শান্ত স্নিগ্ধ নীরবতা ভাসিয়ে নেবে
তোমাকে শীতল জলে।
আজ  বাৎসরিক ডানা দাও
ডানায় লিখে দাও বীজানু আর ঝড়,
উড়তে উড়তে ওই আকাশের ওপারে রেখে আসি 
কারোনায় আম্পান যুক্ত বছরটাকে।
তার পর সূর্যের আলোর পথ ধরে এগিয়ে যাবো 
আমার পুত্র,তার পুত্রের হাত ধরে ।
আকাশ প্রদীপ মাসে তাকাবে অতীতরা নীল চোখ নিয়ে।
আগামী শান্ত আছে জেনে তারও 
নিশ্চিন্তে ঘুমাবে নক্ষত্রের বিছানায়।             
তোমার স্পর্শ পেয়ে শীতল হবো,
আবার সবুজ গাছের বিছানা ডাক দেবে পাখিদের
আবার দিনের আলো হারিয়ে 
যাবে না রাতের অন্ধকারে।
ক্ষুধা হীন পৃথিবীর জন্য,
চক্ষু হীন পৃথিবীর জন্য,
একটা পাগলির জন্য,
আজ একটা আকাশ  দাও
খুব বিশাল না হলেও চলবে,
অন্তত এক খন্ড...


উচ্ছন্নে গেল দেশটা
সত্যজিৎ পাল

আইন কানুন যে ভাঙে ভাঙুক,
যে লুটপাট করে করুক,
আমি করবো না প্রতিবাদের চেষ্টা।
বলবো, উচ্ছন্নে গেল দেশটা।।

গাছ কেটে ঘরে ফার্নিচার গরে,
সবুজায়ন কে ধ্বংস করে,
করবো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে থাকার চেষ্টা।
বলবো উচ্ছন্নে গেল দেশটা।।

কলেজের অধ্যক্ষরা রয়েছেন বসে,
ফোর পাস মন্ত্রী শিক্ষার হিসেব কসে,
আমি করবো না প্রতিবাদের চেষ্টা।
বলবো উচ্ছন্নে গেল দেশটা।।

ওই যে দিনমজুর নেতা, শিখে রাজনীতির জাদু,
ঘোরাচ্ছেন ছড়ি, খাচ্ছেন মধু,
আমি করবো না প্রতিবাদের চেষ্টা।
বলবো উচ্ছন্নে গেল দেশটা।

রাস্তায় মেয়েদের প্রতি বাড়ছে কটুক্তির বর্ষণ,
নিষ্পাপ মেয়ে হচ্ছে শ্লীলতাহানি ধর্ষণ,
আমি করবো না প্রতিবাদের চেষ্টা।
বলবো, উচ্ছন্নে গেল দেশটা।

সার্টিফিকেট মূল্যহীন, এখন চাকরি বিক্রি হচ্ছে,
কেনাবেচার বাজারে চাকরিরও দাম বাড়ছে,
আমি করবো না প্রতিবাদের চেষ্টা।
বলবো, উচ্ছন্নে গেল দেশটা।।

যদি থাকি একসাথে মিলেমিশে,
জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে,
দলবেঁধে করবো প্রতিবাদের চেষ্টা।
তাহলে আর উচ্ছন্নে যাবে না দেশটা।।

তারা
নির্মলেন্দু কুণ্ডু

চুপি চুপি দেখে গেছি আকাশের গায়ে
কতশত তারা আছে ডাঁয়ে আর বাঁয়ে,
কেউ কেউ নামজাদা, কেউ আনকোরা
সবাই এসেছে জুটে একটাই দায়ে ৷

আকাশের গায়ে লাগা জমাট আঁধার,
রাতেতে যখন তার ফুরোয় বাহার 
তারাই তরল করে নিকষ সে কালো
একা চাঁদ কতখানি আলো দেবে আর !

কখনো যদি গো তারা একজোট হয়
( ভেবো না, এ জোট কোন ভোট-হেতু নয় )
পাল্টায় তারা কত আকার-প্রকার
কেউ চায় যুদ্ধ, কেউ প্রশ্ন শুধোয় ৷

তাদেরই মাঝেতে কেউ টং-এ চড়ে বসে
দিক ঠিক করে দেয় সে তো অনায়াসে,
কেউ কেউ থাকে নিয়ে শান্ত সে জ্যোতি
কেউ বা বিষম ফোঁসে একরোখা রোষে ৷

তাদেরও জীবন চলে চাকার মতন,
সবশেষে ঠিকই আসে তাদেরও মরণ,
কালো সেই গর্ততে ঢুকে যায় তারা
কেউ নেই করবে যে তাদের স্মরণ ৷

সব্বার প্রশংসা পায় একা চাঁদ
সে-ই যেন একমেব, বাকি সব বাদ !
মনে রেখো, সূর্যও একখানা তারা
তার আলো না পেলে সব বরবাদ...

শ্রদ্ধার্ঘ্য
শুভ্রা চৌধুরী

আত্মবিস্মৃত হতে অভিনয় নয়,
অভিনেতা হয়ে জন্মালে এমনটি হয়।
কালের যাত্রা ধ্বনি শুনতে কি পেলো?
কোন প্রতিপদে আবারও শ্রেষ্ঠ প্রতিপাদ্য হতে হলো?
বাঙালি, বাংলা তোমায় পেয়ে ধন্য,
বহুমুখী প্রতিভা তে সমাদৃত, তুমি যে অনন্য।
চল্লিশ দিন অক্লান্ত লড়াই শেষে,
নায়ক হারলো? না ফেলুদা হারালে?
অপু চলে গিয়ে অপর্ণা থাকলে,
অপুর সংসার চিত্রনাট্যের  কি হবে?
অমোঘ সত্যি জেনেও কেউ বাস্তব মনে না।
আবেগী বাঙালির আবেগ শীর্ষে তুলে,
সকল আলো নিভিয়ে কোন আলোয় পাড়ি দিলে?
না কি বেলা শেষের অভিনয়
তোমার অভিনয়গুণে বাস্তবায়িত হলো?
অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে।
যে অমৃতের সন্ধানে গেছো অমৃত লোকে,
ইথার তরঙ্গে জানিও ভালো আছো, ভালো থেকো।


কল্প যখন গল্প না 
 প্রিয়েতা ঘোষ

 ছোট বলে ভাবছো তুমি;
 বুঝিনা তো কিছু -
 এসো দেখি একটিবার 
 আমার পিছু পিছু!

কোথায় যাবে? এই তো হেথায়;
 আমার মনের দেশে;
কল্পনা আর ইচ্ছে যেথায় 
স্বপ্নে এসে মেশে !

কল্প যদি গল্প সব‌ই,
বল কেমন করে ?
মাঝ আকাশে উড়োজাহাজ
 এমন করে ওড়ে!

জগতের এই জ্ঞান সাগরে
লক্ষ মানিক ছড়িয়ে-
দু-একটা তার পেয়েছো হাতে
বাকি সবই হারিয়ে।

চাই পেতে সে মুক্তো মানিক
হাতের মুঠোয় একটিবার,
রাস্তা খুঁজে পাবোই; যদি
ইচ্ছেটা হয় দুর্নিবার।

ঘষা মাজা চলছে চলুক
পাঠশালার‌ই বন্ধনে;
গল্প পড়ি ছবি আঁকি
গুপ্তধনের সন্ধানে।

পরীর দেশের গল্প গুলি
মিথ্যে যে নয় বুঝে নাও,
রাস্তা সেথা লুকিয়ে আছে
বুদ্ধি করে খুঁজে নাও।

জানলা খোলো আকাশ দেখো
স্বপ্ন দেখা মন্দ না ,
কাল সে সবই সত্যি হবে;
আজ যা আছে কল্পনা।

হোক না তবে স্বপ্ন দেখা
খুশির তালে বই পড়া,
স্বপ্ন যদি মিথ্যে সবই
মিথ্যে আমার এই ছড়া।।

প্রতীক্ষা
পায়েল দত্ত

'চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি,- বেলা শুনছো ?'

চাকরি পাওয়ার খবরটা আর দিয়ে ওঠা হয়নি,
চাকরিটা যে পাওয়াই হয়নি।
দিন যায় ... সপ্তাহ, মাস যায় ... বছর।
তবু চাকরিটা আর পাওয়া হয়ে ওঠেনি।
সাহস করে এগিয়ে ছিল সে, দেখাই যাক না-
যদিও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী- সার্টিফিকেট
নম্বরের ভারে খুব ভারী না-
শারীরিক ক্ষমতায় উত্তীর্ণ হলে,
পুলিশের চাকরি টা তো পাওয়াই যায়, তাই না?

তবে দুর্নীতির করা যাঁতাকলে
সুযোগটাই পাওয়া গেল না আর।
উল্টো জুটেছে লাঞ্ছনা,
গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার আনন্দের কৌতুক-হাসি।
বাড়িতে বৃদ্ধা মা শয্যাশায়ী, দৈনিক অবস্থা টলমল।
আবেগটা ও যে বড় টলটলে অস্থির ঝিলের মত।
চেষ্টা করেও পারলো না সে,
মৃত্যুকে সে সরিয়ে দিল
অনেক আবেগের সাথে যুদ্ধশেষে
চোয়াল টা আজ শক্ত হলো।
অতঃপর শুরু নতুন পথ চলা।
মনের জোর টার সাথে শরীরের জোর টাও যে বাড়াতে হবে।
পরিশ্র মী শরীরচর্চা, আর নিয়মনিষ্ঠা য় বাঁধতে হবে।

শুরু হলো রোজের  কর্মা বলি-
ভোরের দৌড়ানো  বা বাড়িতে কাগজ দেওয়a
মুটের কাজ হোক, বা ইট বালি মাথায় করে নেওয়া।
যতটা নিজেকে সম্ভব, নিংড়ে দিয়েছে সে
পরিস্থিতি ঘা দিয়ে দিয়ে লোহার পাতের শরীর যে-
অক্লান্ত পরিশ্রম, তার সাথে তালে পড়াশোনা,
দুইয়ের তালে আরো টানটান শিরা।
রক্তের তেজ বাড়তে থাকে, জেদের তেজো অদম।
পরিস্থিতি র ভ্রুকুটি আজ যতই হোক বেদম।
বলিষ্ঠ শরীর, উন্নত শিরে
অবশেষে আজ পরীক্ষা-
ধীর চিত্ত এ উতরে যাওয়ার
টানটান এক সমীক্ষা।

প্রতীক্ষার শেষ, দিন অবসান;
সাফল্যের মুখ দেখা---
উদযাপন নয়, দায়িত্ব অনেক--
তুলে রাখা আছে যত্নে খানেক।
একে একে পাড়া, খুলে খুলে দেখা,
পথেতে চলা শুরু।
নিকাশ যাক সব চিন্তা,
লাঘব ভারের গুরু।

একই প্রেক্ষাপটে, নিয়ে আসে আজ ভাগ্য তাকে টেনে;
গলাধাক্কা দিয়ে বের করে লোক ...
অবাক!! সে যে উর্দ্ধতন তা জেনে
ভাগ্যের ফেরে মুখ থমথমে,
কথা গিয়েছে রুখে
সামনের জন অনেক উঁচু,
তাকাবে কোন মুখে??

ধন্যবাদ টুকু জ্ঞাপন করেছে অল্প হাসে।
কৃতজ্ঞতার ভার নামিয়ে দেবে আজ এটুকু অভিলাষে।
স্পষ্ট উচ্চারণে
নিজের চরিত্র 
নিজেকে আজ প্রমান করে
অনেক উচ্চ বলে
তবু স্মৃতিটুকু থেকে যাবে
চোখের কোনের জলে।


সুন্নত 
হিমাদ্রী মুখার্জী

আমি দেখেছি এক মুসলমান।
কোনো কট্টরপন্থি তাঁর সুন্নত করেনি নিশ্চয়ই।
ধীরে ধীরে কথা বলেন,
সুগভীর আগ্রহের সাথে করেন ধর্ম আলোচনা।
বলেন,'প্রসাদ খেতে আমার বড় ভালো লাগে।'
তারপর বলেন,'একটা তুলসী গাছ দেবেন তো,
বাড়িতে রাখবো।শুনেছি খুব উপকারে লাগে?'
কোনো কট্টরপন্থি তাঁর সুন্নত করেনি নিশ্চয়ই।
তিনি ধর্মের ধ্বজাধারী হলে বেশ হতো।
কিন্তু তার বদলে তিনি দর্জির কাজ করেন।
পোশাকের আঙিনায় ফুটিয়ে তোলেন সমন্বয়ের বাণী।



অপেক্ষায় আছি 
মামনি দত্ত

সেই যে আসি বলে চলে গেলে, 
আর আমি-
বন্ধ দরজার আড়ালে অনন্ত অপেক্ষা। 
অপেক্ষায় আছি অতীত মায়াময় সময় আগলে রেখে। 

বিকারহীন দিনগুলো 
রুক্ষ শরীরের মতন পড়ে থাকে 
যত্নের অভাব অভিযোগে, 

দু'হাতের কোমল মুদ্রায় 
বাঁচিয়ে রেখেছি তোমার চরাচর 
দিন প্রবাহে যদি  ফিরে আসো 
দেখবে আর্ত চোখের স্রোতে 
ভেসে আছে এই ঘর। 

তোমার আগমন
সৈকত সরদার

দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে অজানা সেই এক পথে,
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে সেই ঘুম জড়ানো রাতে।
তুমি এসেছিলে শয়নে স্বপনে; তুমি এসেছিলে নিভৃত গোপনে; আমার নয়ন পথে,
দেখেছি তোমায়  কুয়াশা ঘেরা সেই অজানা প্রাতে।
তুমি চলে গেলে হঠাৎ করে দেখা দিয়ে একবার,
তুমি চলে গেলে পেছনে ফেলে শত শত হাহাকার।
তোমার সাথে নেই পরিচয়; তাও লাগে খুব চেনা,
দেখে মনে হয় তোমার কাছে শত বছরের দেনা।
সবার কাছে চেঁচিয়ে বলি দেখি যদি তোমাকে,
সাথে সাথে তারা একটুখানি বলে যেন আমাকে।
ঋন শোধ করা বাকি যে আছে বহু বছরের জমা,
তোমার সাথে হলেই দেখা লিখব হলফনামা।

ফুল সরিষার 
উত্তম চৌধুরী 

সব পথ নয় সহজের।

কিছু পথ আশ্চর্য বঙ্কিম, 
খানাখন্দ আর কাঁকরের।

সব পথে পাথেয় মেলে না, 
উলটো রেখেই নজরানা 
পার হতে হয় দীর্ঘ সেতু।

সব পথ ঘরমুখো নয়।
যেহেতু বাতাস থাকে তীব্র 
আর বিতর্কিত --চোখে তাই
দ্রুত ফোটে ফুল সরিষার।

সিগন্যাল
শ্রীকান্ত মাহাত

সেভ ড্রাইভ সেফ লাইফ মেনে চলো পথে
দুর্ঘটনার শিকার যাতে না ঘটে।
অকাল মরন---কে দেবে তার ক্ষতিপূরণ ? 
নিয়মবিধি অটুট রেখে---হাঁটো সবে ফুটপাতে।
বল্ ছি ন----ও ভাই গাড়ি রোকো
সবসময় সিগন্যাল এ চোখ রাখো।
লালবাতি থামাও গতি --- হলুদ বাতি হবে রেডি।
সবুজ বাতি জ্বল লো ---গাড়িঘোড়া ছুটলো ।


ভারতবর্ষ ২০২০ 
শোভন সেন

মাইন পাতা আছে যথারীতি,
যথাসময়ে উড়বে মাতৃভাষা,
হাসতে ,খেতে, হবে তথাপি-
মেটাতে এক- জীবন পিপাসা।

না হেসে ভ্রু কুঁচকালেই জানি
স্যাটেলাইট করছে জরিপ;
স্লোগানে প্রতিবাদী হলেই:-
উত্তমাশা অন্তরীপ।

আম্পায়ার বা চতুর্থ স্তম্ভ
ব্যাটসম্যান দলেরই লোক,
ডুবন্ত টাইটানিকে তাই
বেহালা সিম্ফনিই হোক।

মা-মেয়ের ডাকাডাকি
অঞ্জলি দে নন্দী, মম

এক যুবতী ঢাকিনী।
নন্দীদের পুজোয় ঢাক বাজায়।
              একদিন মনে মনে মনে
         বলে সে মাকে,
মা গো আমি কি তোকে 
মন থেকে ডাকিনি?
                  কত্ত কত্ত কত্ত জনে
      তোকে ফুলের মালায় সাজায়।
আমি ক্যানে তোকে
সাজ্জাতে পারি নি?
       আমি তো বোল তুলি ঢাকে-
দুগ্গা মাঈয়া  কী, জয়!
   বল দিকিনি মা!
আমি কী ভক্তিভরে 
বাজ্জাতে পারি নি?
      ক্যানে আমি ঢুকতে পারি নি
তোর ওই ঘরে?
ক্যানে দাঁইড়ে থাকি
শুধুই বাইরে, দূরে,
আঙিনার পরে?
      তুই নোস হামার মাইয়া কী?
            কত্তোই না ভক্তির সুরে
হামি বাজ্জাই হামার এই ঢাক ই!
কত্তো মন থিকে ডাকি
        আমি তোরে!
আমার ঢাক ই
          সদাই বোলে,
জয় দুগ্গা মাইয়া কী!
দ্যায় সারা আঙিনা তোর নামে ভরে।
     এবার তো তুই আমার ডাক!
আমি ঢুকে তোর ঘরে
      পেন্নাম করি ছুঁয়ে তোরে!
শুনে মেয়ের কাতর ডাক,
দুর্গা মা বাইরে এলেন, ঘর ছেড়ে।
    পরনে তাঁর শাড়ি, লাল পেরে।
ঢাকিনীর হাত ধরে
             নিয়ে গেলেন আপন ঘরে।

নতুন সকাল

সুবর্ণা বর্মন

দিগন্তের জোড়া মাঠ
সবুজ চাদরে পতিত 
হয় শোণিত।
বাস্তব কাব্য রচনার ঝড়
তুমুল সমালোচিত হয়।
আবেগ মন্ত্র বারংবার
স্তব্দিত করে অশেষ বাকসিক্ততায়,
বিচারের  শাসনে প্রতিযোগিতার ভার।
ছেঁড়া কাঁথা মোড়া প্রানে
দূর্বলকে অগ্ৰাহ্য করনে ধান্দাবাজের
উসকানিতে জোটে পারিশ্রমিক।
সত্যের ঢেউ জাগ্ৰত হোক মানব কল্যানে।
সূর্যের প্রখর দীপ্তিতে 
আবার নতুন সকাল আড়ম্বরে
প্রারম্বিকতার শুদ্ধ মন্ত্র জপিবে।

ব্যর্থ প্রেমিক
সৌমেন সরকার

আমি এক ব্যর্থ প্রেমিক...

ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে
সার্থক প্রেম আমার আসেনা।
আমিতো ভালোবাসি
তোমার ওই ছোট্ট কপালখানা
তাই,ওখানে চুম্বনের আঁকিবুকি টানি
আর প্রচার করি নিজের প্রেমের ব্যর্থতা...

অন্ধকার ঘরে তোমাকে একা কাছে পেলে
শরীরে শরীরে চুম্বক চুম্বক খেলা আমার আসে না
আমি তো ভালোবাসি তোমার দু'হাত ধরে
অন্ধকারে একটা ক্যান্ডেললাইট ডিনার খেতে
আর তোমার দুচোখে মোমবাতির আলো দেখে
আঁধারের ভিতর একটা মেঠো পথ খুঁজি...

সিনেমা দেখার ফাঁকে অন্ধকার নামলে
শরীরের উষ্ণতা মেটাতে
তোমাকে সজোরে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিতে আমি পারিনা
আমিতো তোমার পিঠের পিছনে ছড়িয়ে রাখি-
আমার শান্ত ডান হাত খানা
বোঝাতে চাই-নামুক আঁধার,ভয় কি,আমি তো আছি

তুমি নতুন পোশাক পরে সামনে এলে
আমার চোখে সার্থক প্রেমিকের মত
তোমার বুকের ফুলে ওঠা দুদিকের উপর
লোলুপ দৃষ্টি জন্ম নেয় না
আমার শান্ত দুচোখ বোঝে তোমাতে শান্তি নীড়
আর খোঁজে,কোথাও কোন খামতি থেকে গেল না তো?

তুমি যখন ভিডিও কলে বলো-
"এই জানো,আজকে তোমার প্রিয় বিরিয়ানী বানাতে গিয়ে,
আমি মাংসটাই পুড়িয়ে ফেলেছি!"
তখন আমি অধিকার ফলিয়ে হেসে উঠতে পারিনা
কেবল টিপিক্যাল অবোধের মত বলি-
"তাতে কি হয়েছে...ওটাই আমার কাছে অমৃত..."
সরস্বতী পূজোতে একসাথে বেরিয়ে
আমি বক্স অফিসে ঝড় তুলতে পারিনা
কেবল হাতে হাত ধরে পথ চলি ব্যর্থ ভাবে
বাসন্তী শাড়ীতে তোমায় কল্পনা করি কোন এক দেবীর সাথে
আধুনিক সার্থক প্রেমিকের মত সেলফি তুলে
সোশাল মিডিয়ায় প্রচারের কথা তখন আমার মনেই থাকেনা!
পুজোর সময় মাঝ রাতে বাড়ী ফেরার পথে
অন্ধকার ওলি-গলি-ঝোপঝাড় খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টার কথা
আমার মাথাতেই আসেনা,
শক্ত করে হাত ধরে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলি
আর মনে মনে তৈরী করী সেই অজুহাত গুলো
যা কাল আবার নতুন করে মাঝরাতে হাঁটাবে,ঠিক এভাবেই...

হ্যাঁ,সত্যিই আমি প্রেমিক হিসাবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ
কারণ শরীর নয়,তোমার ছোট্ট মনকে আমি ভালোবেসেছি,
যদি নিজেকে সার্থক প্রেমিক প্রমানের জন্য
প্রাথমিক রিপুজাত উদ্মাদনা অনুঘটক হয়,
তবে প্রয়োজন নেই আমার সার্থক প্রেমিক হওয়ার
আমি বাঁচতে চাই সারাজীবন;বুকে নিয়ে আমার এই ব্যর্থ প্রেম!

শ্রমিক
সৌভিক ঘোষ

শহর ছেয়েছে অট্টালিকায়,
আকাশ ছুঁয়েছে কারখানা-
কোথায় থাকে এদের কারিগর
আছে কী কারোর জানা?
ইতিহাস রেখেছিল তার হিসাব
লিখেছিল নাম সোনালী অক্ষরে;
মেকী প্রতিজ্ঞা দেখিয়ে সাহেব
চুপ করিয়েছে ইতিহাসকে।
এখনো ওদের স্বপ্ন ভেজে
বৃষ্টি নামলে পড়ে,
আর পাইয়ের হিসাব ভুল বুঝিয়ে
সাহেব, কোটির খোঁজ করে।
কাজ ফুরালে তাদের হিসাব
রাখেনা ইটের শহর,
জানতে চায়না কেও
তাদের পেটের খবর।
রাজপথে আজ রক্ত গেছে মুছে,
নেমে গেছে লাল পতাকা,
থেমেছে ইনকিলাবের চিৎকার,
তাহলে কী আজ প্রতিষ্ঠিত
শ্রমিকের অধিকার?

মহারানী বৃষ্টি
লক্ষ্মীকান্ত দোলই


বৃষ্টি তুমি কীভাবে থাকো, 
     নীল আকাশের কোনে। 
কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়ো, 
   ধরিত্রীর প্রয়োজনে। 

তোমার জন্য নদনদীতে –
     দেখা যায় বান।
বান হলেই মানুষের তখন, 
             বিপর্যস্ত প্রাণ। 

তোমার জন্য পৃথিবী হয়, 
        শস্য শ্যামলা। 
তাই তোমাকে নিয়ে করেছি শুরু
     আমার কথা বলা। 

তোমার তরে বসুন্ধরা, 
    হয়ে ওঠে সরস। 
তোমার ধারায় স্নাত হয়ে, 
    প্রেমিক প্রেমিকা বশ। 

তোমার ধারায় সবাই হারাই, 
    ক্ষণিক শিহরণে।
প্রেমিক মন প্রেমিকাকে চায়, 
প্রেমের আকর্ষণে। 

তোমার প্রাবল্যে নদীতে নৌকা, 
   ক্ষীণতায় থাকে সাঁকো। 
অবুঝ মন বলে সারাক্ষণ, 
    বৃষ্টির ছবি আঁকো। 

তোমার তরে জলে ভরে, 
    নদনদী আর খাল। 
তোমার যৌবন যেন মৌবন,
     যখন বর্ষাকাল। 

তাইতো তোমায় স্বাগত জানাই, 
     হে, মহারানী বৃষ্টি। 
তুমি না থাকলে বন্ধ হতো-
     পৃথিবীর যত সৃষ্টি। 


পতঙ্গ
শান্তা কর রায়

নাটকগুলো এমনি হয়। পরপর দুচারলাইন বলার পর আচমকা গলা দিয়ে আর শব্দ বেরবে না। আগুন জ্বালা হয় রাস্তায়। অগুনতি বাষ্প একজায়গায় বিষ ছড়াচ্ছে । এগিয়েছে পেরেকেবিদ্ধ যিশু, অথবা সেই শিশুটি,যৌনবিকারের শিকার হয়ে মৃত্যুর পর নাটকের চরিত্র । ঠিক কতগুলো বিষের আচড় পাওনা!!
পতঙ্গ পাখা মেলেছে, নির্দ্বিধায় বলতে পারে এরপর অঘটনীয় প্রকল্পে কিকি বাস্তবিক অনুষঙ্গ আসছে । তাইবলে মানুষ উঠে দাঁড়াবেনা! জাগরণ শব্দটা ঘুমের পরেও আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা । পথেঘাটের কোণ বরাবর কৃষ্ণগহ্বরের দিকে ছুটছে কারা!!!  

বশীকরণ
 ডা:শুভায়ু দে


হঠাৎ সেদিন রোব্বারেতে, পুতুলমাসীর ছেলে।
দৌড়ে এলো আমার বাড়ি, সমস্ত কাজ ফেলে।

শুধাই তারে," ব্যাপার কি হে? এর'ম আসার কারণ।"
ও বললে, " আস্তে বলো, চিৎকার যে বারণ।"

ঘাটের পারে বটের ঝুরি,তার নীচেতে বেদী।
সেই বেদিতে নতুন যোগী,পেতে নতুন গদি—

বলছে নাকি সেই যোগীবর, যার যা আছে বায়না।
এক মিনিটেই মিটিয়ে দেবে,বলছে,"কাছে আয়না।"

সকালবেলা তুলসী খেতে,সোমবারেতে উপোস।
শনিবারে ফলাহার, তার চলবে না কো আপোষ।

এসব শুনে হন্তদন্ত  হয়েই রওনা দিলাম।
সাথে নিলাম খুচরো টাকা আর চাকরীর ফর্ম।

সন্ধ্যে হয়ে এস'ছে তখন, ভিড় ও নেই কম।
আমার পালা আসতেই,হাতে গুঁজে দিলাম ফর্ম।

ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল,তারপর বলে," বোস।
তোর কেসটা দেখছি পরে,করবিনা ফোঁসফোঁস।"

অগত্যা আর কিইবা করি, এক একে সবাই।
যার যা রোগ সল্ভ হলো আর পেলো যে তাই দাওয়াই।

অবশেষে ডাক পড়লো,বললেন," একটা দাবী।
এই ফর্মটা ভরবো আমিও,ফিলাপ করে দিবি!"

বর্ষার পসরা
সঞ্জয় সাহা

মেঘের পিয়ন খবর এনেছে শোন
ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে
বৃষ্টির ধারা বাতাসে বইছে আজি
শক্তির ধারা হারিয়ে থেমে গেছে শেষমেশ  |

রজনি শাওন ঘন, মেঘ দেয় গর্জন
ঝিম ঝিম শব্দে বইছে বৃষ্টি
পদ্মপুকুরে শুরু হলো হইচই
স্বর্ণালী রোদের আজ দেখা কই  |

টুপটুপ করে ঝরে যায় অবিরাম
গুরু গুরু গর্জনে, মেঘ আজ শিহরে
নদীর উতলায় শিহরণ জাগে
বর্ষার পসরা সাজায় নীল ঘনবনে ||

ফেরারী স্বপ্ন
ব্যাসদেব গায়েন 

বাঁশের ব্যারিকেড করে আটকে দিচ্ছি
সমবেত স্বপ্নের গতিবিধি
এখানে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেই
মুখ থুবড়ে পড়বে সভ্যতা
আমাদের উৎসাহ দুমড়ে মুচড়ে
চার দেওয়ালের ভিতর ছুঁড়ে ফেলে
ফেরারী জীবন যাপন করে চলেছি
আকাশে কালবৈশাখীর ভ্রুকুটি
ঠেলে দেয় অনিশ্চিত অধ্যবসায়ের কালকুঠুরিতে
সময় এসেছে ঐক্যবদ্ধ ছেড়ে এক হওয়ার
সময় এসেছে উৎসারিত আলোয়
ক্ষুধার্ত মানুষের দিকে চেয়ে দেখার...



শব 
সাত্যকি

হাতের থেকে ঠিকরে উঠছে ধোঁয়া
গায়ের থেকে নেমে আসছে আগুন রঙ
সারা শরীর জুড়ে শুধুই পোড়া গন্ধ
মাথার চুলগুলো আর সৌন্দর্য দেয় না
গায়ের লোম থেকে বেড়িয়ে আসে না ঘাম
শুধুই দগ্ধ সাম্রাজ্যের দেওয়াল
পোড়া গাছের মত ফাটলের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসছে
কালো রক্ত, পুঁজ, খসে পড়ছে এপিডারমিসের আস্তরণ
জীর্ণ হয়ে যাচ্ছে হাড়ের শক্ত বাঁধন
বিতর্কিত শব্দের ভিড়ে চাঁপা পড়ছে দেহজ প্রাকৃত শব!

বিহনে
সুরভী চ্যাটার্জী

এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়, ভালোবাসার হাত ছোঁয়া ।        
আলো-আঁধারি খেলায়,
মনের তল্লাটে দাপুটে ঝড়ো হাওয়া ।
নতজানু হয়ে গোলাপে চুম্বন,       
প্রেমিকের  তারস্বর আমি আছি ,আমি আছি,
সোহাগী আলাপন। 
রাত পোহালো ভোরের প্রসবে,
সময়ের প্রশ্রয় বছর।          
ভাগ্যলুটে গ্রন্থি বদল, ছোঁয়ানিষেধ  ও মুখের আদল,
মন্দ বাসায় জীবন চোয়ানো আবেগ।

কবিতাযাপন
দেবাশিস সরখেল

রাজার প্রতি তবুও অবিশ্বাস নেই তার। হয়তো মেইল করে কিম্বা জেরক্স করে পাঠিয়ে থাকবে।
আশীষ ভাবে সে লেখে শুধু প্রকাশের তাগিদ খুব একটা নেই। তেমনি চাকরী করে, সংসারে থাকে বিয়ে করারও খুব একটা ইচ্ছে নেই তার। বাড়ির লোকজন চেষ্টাচরিত্র করে ছেড়ে দিয়েছে।
এবার সুছন্দার একাকীত্ব তাকে নাড়া দেয়।
সে কি রাজার প্রতি কোনো দ্বেষ তৈরি করতে চায় তার মনে।
জীবনানন্দকে মনে পড়ে খুব।
প্রনয়ের প্রথম কথা মনে হয় দবেষ। সুছন্দার প্রতি কেমন যেন টান অনুভব করে সে। মায়া জমায়।
হঠাৎ সুছন্দাকে ফোন করে বসে, তোমার কি খুব একা লাগে সুছন্দা ?
 ওপার থেকে অনুযোগ। - তুমি যদি বুঝতে, কবিতা ছাড়া তো আর কিছু ভাবলে না।
তবে তুমি বিনয় হতে পারবে না, এটুকু বলে দিলাম। একদিন সময় করে এসো।

 ছাড়পত্র 
ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়


আরো একটা  বছর 
পার  করে  দিলাম  ।
নতুন  স্বপ্ন 
নতুন আ‌শার
প্রতীক্ষায় রইলাম। 
কেমন হবে  নতুন বছর 
কেউ জানে  না। 
ভাগ্যর হাতে  সব  ছেড়ে  দিলাম। 

আরো  একটা  বছর 
থাক বার  ছাড়পত্র  পেলাম ।
ভাগ্যদেবতাকে  হাজারো  সেলাম। 
 হয়তো  কেউ  দুঃখ  দেবে 
কেউ  বা  কাছে  ডেকে  লবে। 

অদৃষ্ট র হাতে  হাল ছেড়ে  দিলাম। 

ভেবে  নেই কোনো  লাভ,  বাচাটাই  বড়  পাওনা। 
ছাড়পত্র  পেয়ে ও  দেখি কত  সব বাহানা।।





ভিক্টোরিয়ার ফোকলা দেয়াল 
স্নেহাশিস মুখোপাধ‍্যায়

ভেতরে অনেক অস্ত্রশস্ত্র আছে।
রানীর পরীটি আর নাচে না।
তিনটে গাছ শ্বেতদেওয়ালটা আড়াল করে আছে। 
এপারে জলে বিলম্বিত তাল...
জল তো আর হাসে না!
 
আসলে গাছের মাথায় অনেক অন্ধকার।
অন্ধকারটা দেওয়ালে ছড়িয়েছে।
লেকের পারে খোলামেলা প্রেম -
রাস্তা থেকে চোখ চলে যায় - 
তপ্ত কিছু দৃশ্যে উঁকি দিচ্ছে কেউ, 
গাঢ় কিছু দৃশ্য হয়েছে।

চারপাশে এর গাছের পাঁচিল - 
মোরাম দেওয়া চওড়া সাদা রাস্তা... 
ঠোঁটের চেনা খাঁচার ভেতর জমে আছে
শ্বাসপরীদের গরম প্রস্রবণ।
স্নান করতে ইচ্ছে করে ঢেউয়ের মাথায় উঠে।  

তখন আমার সারা শরীর তপ্ত ঘামে ভেজা।
তাছাড়া ওই মরীচিকায় আমার আরো অসুখ বাড়ে।  
তখন আমি শহর জুড়ে বৃষ্টি চাইছিলাম।
মিথ্যে কথা, কাজের দিনে কে বৃষ্টি চায়!
বৃষ্টি শুধু হাঁফিয়ে মরে চাওয়ার উপেক্ষায়।

আসলে আমি সেই লোকটার পেছনে দাঁড়িয়েছিলাম। 
লোকটা কেন দাঁড়িয়ে থাকে সে কথা খুঁজছিলাম।
তা বলে কি অন্য চুমু দেখিনি -  
অন্য কোনো উপত্যকার নিচে?
শহরে চুমু দ্যাখা যায় না, 
চুমু-ই আসে শহর দেখতে। 

স্মৃতি আমার সুখের নাম 
পর্ণা দাশগুপ্ত মিত্র

আমার ছেলেবেলার নাম
আমার সবুজ মাঠ শিরিষ গাছ কাঠঠোকরা পাখির নাম।
বেহুলা গাং কচি অসভ্যতা আর কিশোরি বেলার লুকিয়ে চিঠি পড়ার নাম।ধুলোর পলেস্তারা পড়া বাক্সটার নাম স্মৃতি।
কখনো ঝেড়ে মুছে খুললেই 
কোনো সুন্দর গন্ধ থেকে থেকে সোঁদা হয়ে গেছে
মিষ্টি কোনো সুর রিন রিন করে মাথায়
আরো কত কি ... শব্দ ; সাড়া দেওয়ার কিংবা হুতাশী নৈঃশব্দ ..
প্রথম কিছু অবাক বিস্ময়।
ঝড় ঝাপটা ...
আস্তরণ ঠেলেও কত কিছুর নাগাল পাই না।
সব স্মৃতি স্মৃতিতে এখন ...

আসলে এখন আমরা
নিমাই আদক

সোঁদা মাটির গন্ধ অনেক দিন নাকে আসেনি
সবুজ মাঠে জল থইথই দৃশ্য অনেক দিন চোখে দেখিনি
আকাশবাণীর কৃষিকথার আসর অনেক দিন কানে শুনিনি
এসব দেখা - শোনার সময় বড় কম .......
#
আসলে এখন আমরা এক একজন অন্ধ- বধির

খিদের সাম্রাজ্য
শুভজিৎ বোস

দোকানে নীল শাড়ি জড়িয়ে ছোট্ট একটি মেয়ে এসেছে,নাম তার রঙিলা
হাতে দশ টাকা নিয়ে ও কিনতে এসেছে গরম মুড়ি,
ওদের ভেতর খিদের দাবানল যখন যখন জ্বলে ওঠে •••
মুড়ি তখন দাবানল নেভাতে ঝরঝরে সাদা ভাত হয়ে ওঠে !
দুদিন আগে বাবা-মায়ের সাথে ও একটু সাদা ভাত খেয়েছিল,
তখনি বমি হয়ে পড়ে গিয়েছিল সে ভাতটুকুও !
কারণ সে ভাতের মধ্যে ও দেখতে পেয়েছিল বাবা-মায়ের পরিশ্রমী বুকচেড়া রক্ত!
সে রক্ত চোখ দিয়ে দেখা যায় না,তাকে হৃদয় থেকে উপলব্ধি করতে হয়।
তার রৌদ্রোজ্জ্বল সকালটা আজ ছিল লাল’চা-মাখা ভাত সাম্রাজ্য,
পাড়ার বারোয়ারী দুর্গাপুজোও এই ভাত সাম্রাজ্যের বর্ণিল যুদ্ধের কাছে পরাজিত।
ওর নীল শাড়িটিতে অসংখ্য জোড়াতালি,তবুও তার সৌন্দর্য এতটুকু ম্লান হয়নি ওর কাছে!
আজও তার খিদের সাম্রাজ্যে-রাত ছড়িয়ে দেয় জোৎস্নাভেজা ফুরফুরে মুড়ি,ভাত ঐ
সাম্রাজ্যে ফুল ফোঁটাতে পারে না প্রতিদিন !
দুরন্ত খিদের দাবানলে বৃষ্টি হয়ে আজও আগুন নেভাতে পারে না ঐ সাদা ভাত !
দুঃখদেবতাকে বারে বারে ও প্রশ্ন করেছে !উত্তর এসেছে তুই গরীব !
তুই তোর সাম্রাজ্য নিয়েই থাক।দুর্গাপুজো,রথযাত্রা উৎসব নিয়ে তোর কিসের
এতো বেহিসেবি ভাবনা !
এগুলি যে তোর জীবনের লক্ষণরেখা অতিক্রম করার মতো !
সে রেখা অতিক্রম করলে তোকে খাবলে খাবে শোক,খাবলে খাবে যন্ত্রণা !
আর তুই সেই অভুক্ত মিছিলে হারিয়ে যেতে থাকবি ক্রমাগত নিষ্পেষিত হয়ে।

সহন ও শক্তি
নীহার জয়ধর


ঢেউয়ের অসহ‍্য রঙ ধুতে গিয়ে চোখ বুজে /
মুছে গেল পথ, লাল ঠিকানার খামে আঠাহত সময় /
ছিঁড়ে গেলে স্মরণীয় পাতা ও অক্ষর /
পথ জল মেপে শরীর পাল্টায় /
সঙ্গত কারণ আর যোগ‍্যতা মুখোমুখি /
টেকসই রঙ আর আঁশ খসা চামড়া /
ক্ষমতাসীন আর বিরোধী আসন /
একদিন আগুনে ঢুকে দেখ, একদিন সর্ষের তেল মেখে।

                   ##

যতটুকু কর্ষণযোগ‍্যতা রক্তে থেকে গেছে /
দাঁড়িয়ে থাকতে চাই সাঁড়াসাঁড়ি বানে /
পলির হিসাব হোক নিরঙ্কুশ সংখ‍্যাগরিষ্ঠতার আগে /
কর্ম আর জ্ঞানযোগ হেঁটে বেড়িয়ে আসুক মিছিলের রাস্তায় /
রঙ আর আগুন ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় প্রকট করে বংশ পরিচয় /
গাছ আর তলার মালিকানা শ্লেষ্মাত্মক হলে।

বৃষ্টি 
ঝিলিক রায়

বৃষ্টি  বৃষ্টি বৃষ্টি 
এ এক অপরূপ সৃষ্টি 
মেঘপুঞ্জ জমাট বেঁধে 
হয় যে ইহার সৃষ্টি 
গ্রীষ্ম তাপের প্রবাহ থেকে 
খরা জ্বালার দুঃখ থেকে 
পাই স্বস্তি বৃষ্টি থেকে 
তাই বৃষ্টি হল 
সকল প্রাণের সৃষ্টি।


আমি অ্যামাজনের ঘাস
শ্যামল কুমার রায়

আমি অ্যামাজনের ঘাস গো বাবু! 
চিনতে পারলে নে?
এই তো ক'দিন আগেই,
তোমরা বাবুরা রাতের আঁধারে
ডলে দিলে আমার যৌবন।
দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিলে আমায়
তোমরা নাকি ওখানে মধু খুঁজে পেয়েছো?
তাই তো সরিয়ে দিলে আমায়।
কিন্তু মারতে পারলে না!
অনেকটা দূর থেকে দেখি তোমাদের
চেয়ে দেখেছো, আমরা আবার বাড়ছি? 
তবে আমরা তোমাদের সরিয়ে নয় গো,
সঙ্গে নিয়ে বাঁচবো।

আপনি কিছু দ্যাখেন নি...
অমলেন্দু কর্মকার

চোখের সামনে যাই ঘটে যাক,
কেউ তো গায়ে মাখেন নি!
আপনার কী ফাটছে মশাই?
আপনি কিছু দ্যাখেন নি৷

অসভ্যতা আকছার , তাই
মুখ খুলবেন? জানেন নি?
কার্টুন দেখুন, সুস্থ থাকুন,
আপনি কিছু দ্যাখেন নি৷

সবাই যখন নিচ্ছে মেনে,
আপনি কেন মানেন নি?
প্রতিবাদী হবেন না স্যার,
আপনি কিছু দ্যাখেন নি৷

বোবাকালার শত্রু বিরল,
ছেলে মেয়ে দের শেখান নি?
নীতি ছাড়ুন মাষ্টার মশাই ,
আপনি কিছু দ্যাখেন নি৷

দেশোদ্ধারের ভাবনা ছাড়ুন,
সঙ্গে কাউকে পাবেন নি।
ভালো মন্দ দেখুন ...  কিন্তু,
আপনি কিছু দ্যাখেন নি৷

প্রতিবিম্ব
ভাস্বতী দেব

নীলচে শরীর নিয়ে 
আবার তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি,
এবার বলে দাও তোমার অভিজ্ঞতার সংখ‍্যাগরিষ্ঠ উৎকন্ঠা
হ‍্যা হ‍্যা বলেই দাও তোমার সিন্দুকের চাবির 
বাক্সটার উর্দ্ধপ্রান্তে থাকা নিয়মের কথা,
আমি প্রস্তুত,
একরাশ আগ্রহভরা চিত্ত নিয়ে তোমার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছি।
তুমি বলবে,"কবি, এ তো আমার নয়
এর সন্ধান তো তুমি আগেই পেয়েছো ছিন্ন তরুমূলে,
যখন অস্তকালীন সূর্য মাথার ওপর 
এঁকে গেছিল আত্মপ্রকাশের চারুকলা।"
বিস্ময়ে হয়তো আমার মনে পড়ে যাবে
উল্লসিত বিকেলের গভীর অনুরাগ,
তবুও ঝরাপাতা রয় যে বড়োই একা।
মদিরার ঘনঘটায় সে কেবলই অবিকশিত।

তবে আজ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না,
না পারছি না, তোমার চোখের দুধারে থাকা
ওই কৃষ্ণবর্ণা অনুভূতিকে গ্রহণ করতে।
হিংস্রতার আগুনে জ্বলেছি,
বঞ্চনাকারী সত‍্য বিকলাঙ্গ হয়ে ভিক্ষা চেয়েছিল
আমার হিয়ার মাঝে-
আর যন্ত্রণার ছুরি বসিয়ে দিয়েছিলো বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে,
বিশ্বাসঘাতক! থাবা বসিয়েছে গাঢ়ত্বের মুকুটে।
বুঝলে কি প্রতিবিম্ব? লিটমাস এর মতোই
 লাল থেকে নীল হয়েছি, তোমায় জানার প্রয়াসে।
এবার মুক্তি দাও,
আলোর সাম্রাজ‍্যে একটু পরিভ্রমণ করে আসি,
আবার এবং আবার,
শুধুই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আশায়।
নতুন করে পাব বলেই 
আমাতে হারিয়ে যাই বারেবারে।

সনেট - বৃষ্টির প্রতি 
এন. সিতকুন্তল রায়


তোমারে যে দেখেছিনু, আকাশের কোলে
মেঘরূপে। ধীরে ধীরে ঘন কালো চুলে,
বিজলীর মালা প’রে, মেঘের গর্জনে
বাতাসের উন্মাদনা সহ। বৃক্ষলতা
ভূমি পরশিয়া, স্বীকারিলা নতি তব
প্রতি। পাইয়াছি তোমার আশ্বাস, তুমি
অবতীর্না হইতেছ, ল’য়ে ভব স্নিগ্ধ
বারিধারা। ওগো বৃষ্টি, তুমি অপরূপা!
তুমি রিমঝিম নূপুরের তালে, ধরা
তলে দিয়াছ যে ধরা। আপন খেয়ালে
ভূমি পৃষ্ঠে নৃত্যরতা বালা! জানি আমি
স্পর্শে তব ধন্যা এই ধরা। বৃক্ষরাজি
প্রাণীকূল, নদনদী, গিরিশ্রেণী, নতি
জানায় তোমারে, সহ এই পথকবি।


মনগড়া কবিতা ১
অনির্বাণ ঘোষ

বিড়ালটার পেছন পেছন আজ সারাদিন ছুটে বেড়ালাম-
বিড়ালটা কতো অলিগলি চেনে,
তারপরেও দিব‍্যি চলে আসে পাশের বাড়ি-
আশ্রয় নেয় সাইকেল শেডের নীচে...
ওর পিছু পিছু গিয়ে জানতে পারলাম
এ পাড়ায় সমস্ত কিছু ঠিক আছে,
শুধু পাড়ার ছেলেরা একটু চাঁদা বেশি কাটছে-
তবু হইহই করে সবাই বেরিয়ে পড়ে অঞ্জলি দিতে।
বিড়ালটার থেকে অনেকটা দূরে বসে আছি আমি-
ছেলেবেলার বন্ধুরা ডেকে গেছে পাশের বাড়ির বুড়ো সুমনকাকুকে...
ঐ তো খুশির দিন আসছে,
চলে আসবে খুব তাড়াতাড়ি-
আর চিন্তা নেই,জানালার পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছে দুটো শুকনো নদী-
ওদেরও নেমন্তন্ন করেছি...
ভালো লাগছে আমার
খুব ভালো লাগছে —
হাসতে হাসতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে মানুষ,
চলো, নতুন জুতো পরে পা-মেলাই ঐ কালো বেড়ালটার সাথে।

তবু বয়ে চলে
দীপাঞ্জন সাহা

লজ্জার সাজঘরে, বেবাক হয়ে থাকো তুমি
অন্তর্যামী হয়ে ... তাকিয়ে থাকো অভিনেতার দিকে।
আবহমান কালব্যাপী তুমিও নট্, সুকৌশলী!
নির্মাতার ছদ্ম আড়ালে নিজেকে রাখো উপেক্ষিত।

অন্ধত্বের অন্ধকার ঘনীভূত হয় চারপাশে,
জেগে ওঠে রাক্ষুসে আগাছের দল ...
তুমি তখন প্রশ্রয়দাতা, কল্পকাহিনীর দর্শক
নিদ্রাহীনের চোখে জ্বালাও তন্দ্রার নেশা!

ক্ষতবিক্ষত দেহ, মাংসপিণ্ডের দাহ্য, মুক্তির অনল
চোখে ছেয়ে যায়, হয়তো বা মনেও!
বাস্তবতার চূড়ান্তে লাগে অপ্রত্যাশিত আঘাত,
ভেঙে পরে সুনির্মিত অট্টালিকা।

কোথাও দহলে দাহিত হয়ে, নিভে যায় সব,
আবার কখনো দৃষ্টি, তাঁর মহাশূন্যের দিকে।
কৃষ্ণগহ্বরে শোষিত হয়ে যায় যা কিছু আছে,
শুধু মন্থরভাবে বয়ে চলে সময় ... তবু বয়ে চলে ...
              














পূর্বকথন:-জরায়ু ক্যান্সারের সূচক সি.এ.১২৫ রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট অস্বাভাবিক রকমের বেশি আসে জয়িতা নামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ের,ইতিমধ্যে ইউ.এস.জি রিপোর্ট জানান দিয়েছে টিউমারের অস্তিত্ব। বাড়িতে প্রথমে লুকিয়ে রাখলেও পরে জয়িতার মায়ের হাতে এসে পরে রিপোর্টগুলো।এ সময় পাশে এসে দাঁড়ায় জয়িতার প্রাণের বন্ধু শর্মি।

- ৩ -

   সরিৎ এর জীবনে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে অর্থাৎ এই রক্ত রিপোর্ট নেওয়ার জানালার কাছে অসুস্থ হয়ে পড়েছে অনেকেই। কিন্তু এই মেয়েটাকে দেখার পর থেকেই মনটা কেমন যেন অগোছালো হয়ে আছে,কেমন যেন দুঃখী ভাব আছে ওর মুখের মধ্যে আর চোখ দুটো যেন মায়া দিয়ে তৈরী। জীবনে অনেক যুদ্ধ করে অনেক পরিশ্রম করে এই সরকারী চাকরীটি জুটিয়েছে সে। যদিও সে হাসপাতালে র চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী তবুও কর্মক্ষেত্রে একটা নিরাপত্তা তার আছে। কিন্তু সেদিন সি.এ. ১২৫ রক্ত রিপোর্টের দিকে নিবদ্ধ মেয়েটার দৃষ্টি দেখে সরিৎ বুঝতে পেরেছিল নিরাপত্তা ব্যাপারটা ভীষণ আপেক্ষিক। কখন যে কিভাবে কার জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে যাবে তাই কেউ বলতে পারে না। না হলে সে কী দোষ করে ছিল যে জন্মাবার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার স্থান হয় অনাথ আশ্রমে আর কী দোষ করেছিল জয়িতা নামের এই মেয়েটা যে ওর জীবনে আসতে চলেছে এক প্রবল ঝড়। সে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে পেশেন্টের নামের জায়গায় ইতিমধ্যে দেখে নিয়েছে মেয়েটির নাম আর এও দেখে নিয়েছে সি.এ বা ক্যান্সার অ্যান্টিজেনের মাত্রা চিন্তাজনক ভাবে বেশি। বোধহয় শুরু হতে চলেছে আরেকটা লড়াই আরেকটা কর্কটক্রান্তি।
     ‌‌‌‌ হাসপাতালের কাছেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে সরিৎ। সপ্তাহের ছ'দিন হাসপাতালের ডিউটির শেষে রবিবারে বা ছুটির দিনগুলিতে সে চলে যায় তার তথাকথিত আঁতুরঘর অনাথ আশ্রমে। সেখানে সে খুঁজে পায় তার শৈশব,তার কৈশোর আর খুঁজে পায় অশীতিপর বৃদ্ধ ফাদার জন'কে,যিনি একাধারে সরিৎ এর মা এবং অন্যদিকে বাবাও।সরিৎ জানে যে সে তাঁর এই অফুরন্ত স্নেহের প্রতিদান কোনোদিনই দিতে পারবে না, কিন্তু সপ্তাহের ঐ একটা দিন সে যখন আশ্রমের ছেলেদের জন্য চকলেট, খেলনা,ফল ইত্যাদি নিয়ে যায় সেদিন সে ফাদারের মুখে যে অপার্থিব হাসি দেখতে পায় তা তাকে সারা সপ্তাহের কাজের প্রেরণা জোগায়।এ সপ্তাহে সরিৎ ফাদারের সঙ্গে দেখা করার পর যখন গোধূলি মুহূর্তে আশ্রমের সাজানো বাগানে এসে বসে তখন ডুবন্ত সূর্যের আলোয় মাখা আকাশের দিকে তাকিয়ে সরিৎ এর বুকটা কেমন যেন করে উঠল,মনের অতল জলের গহীন থেকে ভেসে উঠলো একটা মুখ, জয়িতা!
         জয়িতা চোখ মেলে দেখলো মাথার কাছে চিন্তিত মুখে বসে আছে শর্মি।জ্ঞান ফিরতেই দেখেই সে জ্ঞিজ্ঞাসা করে এখন কেমন বোধ করছিস জয়ী? উত্তরে শুধু একটু হাসবার চেষ্টা করে জয়িতা, তারপর আবার চোখ বোজে। আজ রাতের খাওয়ার পর হঠাৎ তলপেটে ব্যথা শুরু হয় জয়িতার সঙ্গে একটা গা গুলোনো ভাব, ঝটপট বাথরুমে যেতে গিয়ে হঠাৎ চোখে অন্ধকার দেখে সে,তারপর আর কিছুই মনে নেই। চোখ বোজা অবস্থাতেই সে শুনতে পায় কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে শর্মি ফিস্ ফিস্ করে বলছে, অনেক ব্লিডিং হয়েছে জয়ী, বাথরুমের সামনেটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।
          রাতের বেলা লাইট নিভিয়ে দিয়ে দরজায় কাছে দাঁড়ালো সরিৎ। আজ আরেকবার রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিতে এসেছিল জয়িতা, সঙ্গে আরেকটি মেয়ে ছিল, যতদূর মনে হয় ওর বান্ধবী এবং রিপোর্টের ধরন আর ওদের দুজনের মধ্যে কথাবার্তা শুনে মনে হল খুব শীঘ্রই জয়িতাকে জরায়ুর থেকে নেওয়া স্যাম্পেল পরীক্ষার জন্য ভর্তি হতে হবে গাইনি বিভাগে।সরিৎ এর ইচ্ছা হল যেকোনো ভাবে সাহায্য করে মেয়েটাকে, কিন্তু কেন এই ইচ্ছা হচ্ছে তার? হাজার হাজার রোগী আসছে হাসপাতালে,কই তাদের কাউকে দেখেতো তার একথা মনে হয়নি।তবে কি সে দুর্বল হয়ে পড়ছে জয়িতা নামে মেয়েটির প্রতি!
                                                   ক্রমশঃ ....











2 comments:

  1. ইলশেগুঁড়ি পত্রিকাটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে oasis এর মত। এক পশলা বৃষ্টির মত আনন্দ দেয়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ প্রিয় পাঠিকা।

      Delete

Theme images by luoman. Powered by Blogger.